Various Images of Accounting
বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থার চলমান ধারাবাহিকতার প্রধান বাহক ও ধারক হচ্ছে হিসাববিজ্ঞান। হিসাববিজ্ঞান হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যা কোন সংস্থা বা সংগঠনের অর্থনৈতিক কার্যকলাপ সম্পর্কিত
প্রয়োজনীয় আর্থিক তথ্যগুলো পরিমাপ করে এবং বিভিন্ন ব্যবহারকারীর নিকট তা জ্ঞাপন করে। হিসাববিজ্ঞানের এরূপ সেবাদানের ফলে সমাজের বিভিন্ন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নিকট এর কিছু ভাবমূর্তিও তৈরি হয়েছে।
বিখ্যাত লেখক Ahmed Belkaoui (আহমেদ বেলকউই) তাঁর Accounting Theory গ্রন্থে তাঁর নিজস্ব ভঙ্গিতে হিসাববিজ্ঞানের ছয়টি ভাবমূর্তির কথা উল্লেখ করেছেন। এগুলো হচ্ছে –
1. কারবারের ভাষা হিসেবে হিসাববিজ্ঞান (Accounting as a Language of Business) : হিসাববিজ্ঞানকে কারবারের ভাষা বলা হয়, কারণ কারবার সম্পর্কে
প্রয়োজনীয় তথ্য জানার জন্য এটি একটি প্রধান মাধ্যম। হিসাববিজ্ঞানের সুনির্দিষ্ট নীতি ও কায়দার অধীনে হিসাববিজ্ঞান ভাষা পরিচালিত হয়। হিসাববিজ্ঞান ভাষার উপাদানসমূহ হচ্ছে-
(ক) বিশেষ পরিভাষা (Terminology),
(খ) শব্দ সংকেত (যেমন: ডেবিট Dr.ও ক্রেডিট Cr.),
(গ) পদবাচ্য (যেমন- Balance; সত্তাধিকার- Equity; নিট সম্পদ- Net Asset; রেওয়ামিল- Trial Balance; শেয়ার প্রতি আয়-Earning per Share এবং
(ঘ) ব্যাকরণ (যেমন- দু’তরফা দাখিলা পদ্ধতি- Double Entry system),
হিসাববিজ্ঞান ভাষাগত এসব উপাদান ব্যবহার করে আর্থিক ঘটনাবলীকে প্রমাণসহ লিপিবদ্ধ করে এবং উপাত্ত তৈরি করে ও সমাবেশ করে। তাই আমরা হিসাববিজ্ঞানকে প্রকৃত অর্থেই কারবারের ভাষা বলতে পারি ।
2.ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে হিসাববিজ্ঞান (Accounting as a Historical Record or Document): হিসাববিজ্ঞান মালিকের সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার ও সংরক্ষণের লক্ষ্যে
তদারকি ও তত্ত্বাবধানের (Stewardship) কাজ করে। হিসাববিজ্ঞান দলিলসমূহ প্রতিষ্ঠানের মালিকদের জন্য তাদের সম্পদের ব্যবস্থাপকের তত্ত্বাবধানের ইতিহাস সরবরাহ করে।
3.বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে হিসাববিজ্ঞান (Accounting as Current Economic Reality ) : হিসাববিজ্ঞানকে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা প্রতিফলনের মাধ্যম
হিসেবেও ধরা হয়। এ ধারণা বা দৃষ্টিভঙ্গি প্রণেতাদের মতে, উদ্বর্ত পত্র এবং আয় বিবরণীর মূল্যায়ন ভিত্তি এমন হওয়া উচিত, যাতে অতীত খরচ (Historical cost)
এর চেয়ে তা অর্থনৈতিক বাস্তবতার অধিক প্রতিফলন ঘটাতে পারে। এক্ষেত্রে তাই অতীত মূল্যের চেয়ে বর্তমান ও ভবিষ্যত মূল্যকে অর্থনৈতিক বাস্তবতার অধিক প্রতিফলিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
হিসাববিজ্ঞানের এ ভাবমূর্তির প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে ‘সত্য আয়” (True Income) নির্ণয় করা এবং এ ধারণার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের সম্পদের পরিবর্তন প্রতিফলিত হয়।
4.তথ্য পদ্ধতি হিসেবে হিসাববিজ্ঞান (Accounting as an Information System) : হিসাববিজ্ঞানকে সর্বদাই একটি তথ্যপদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। হিসাববিজ্ঞান হলো
একটি প্রক্রিয়া যার মধ্যে আনুষ্ঠানিক তথ্য ব্যবস্থা ক্রিয়াশীল থাকে। সুতরাং হিসাববিজ্ঞান একটি প্রক্রিয়া যা একটি তথ্য উৎস বা প্রেরক; একটি যোগাযোগ প্রণালী এবং একগুচ্ছ গ্রাহক (বহিস্থ ব্যবহারকারী)
এর মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে।
5.পণ্য হিসেবে হিসাববিজ্ঞান (Accounting as a Commodity): হিসাববিজ্ঞানীদের সেবাদান কার্যক্রমকে তথ্যবাজারে একটি পণ্য স্বরূপ বিবেচনা করা হয়। কারণ অর্থনীতির বাজারে
হিসাববিজ্ঞান কর্তৃক উৎপন্ন ও পরিবেশিত বিশেষ ধরনের তথ্যের চাহিদা রয়েছে এবং হিসাববিজ্ঞানীগণ এসব বিশ্লেষণধর্মী তথ্য সরবরাহ করে থাকে। এ কারণেই হিসাববিজ্ঞানকে শুধু এর উপযোগিতার মাপকাঠিতে
মূল্যায়ন করা হয় না বরং তা ব্যয় সুবিধা বিশ্লেষণ (Cost- Profit Analysis) এর মাপকাঠিতেও করা যায়।
6.ভাবতত্ত্ব হিসেবে হিসাববিজ্ঞান (Accounting as an Ideology): বর্তমান সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিন্যাসকে টেকসই ও আইনগত বৈধতাদানের মাধ্যম হিসেবে
হিসাববিজ্ঞানকে একটি ভাবতাত্ত্বিক ঘটনা (Ideological phenomenon) হিসেবে ধরা হয়। হিসাববিজ্ঞান মুনাফা অর্জন বা মুনাফা সর্বাধিকীকরণ এই চেতনাকে ধারণ করে এবং সামাজিক
কল্যাণমূলক চেতনা পরিহার করে। তাই কার্ল মাকর্স বলেছেন, “হিসাববিজ্ঞান মিথ্যা চেতনার একটি ধারণাকে সাধন করে থাকে এবং উৎপাদন প্রচেষ্টার যে সামাজিক সম্পর্ক তার সত্য প্রকৃতি উন্মোচন করার
চেয়ে তাকে রহস্যাবৃত করার একটি উপায় বাতলে দেয়।”
আহমেদ বেলকউই (Ahmed Belkaoui) এর উপরোক্ত ছয়টি ভাবমূর্তি ছাড়াও হিসাববিজ্ঞানের কিছু সাধারণ (Common) ভাবমূর্তিও রয়েছে । নিম্নে সেগুলো আলোচনা করা হলো:-
1. হিসাববিজ্ঞান আর্থিক ফলাফল নির্ণয়ের বিজ্ঞান (Accounting as a Science of Measuring Financial Result) : হিসাববিজ্ঞান সকল আর্থিক লেনদেনের সঠিক
ও সুশৃংখল হিসাব নিকাশ সংরক্ষণে শিক্ষা দেয়। দু’তরফা দাখিলা পদ্ধতির নিয়মানুসারে হিসাবরক্ষণের জন্য অতি সহজেই প্রয়োজনীয় হিসাব প্রস্তুতকরণের মাধ্যমে ব্যবসায়ের ফলাফল নির্ণয় করা যায় এবং
আর্থিক বিবরণী প্রণয়নের মাধ্যমে ব্যবসায়ের আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে ধারণা নেয়া যায় ।
2.স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা সৃষ্টিকারী বিজ্ঞান (Science of Transparency & Accountability): হিসাববিজ্ঞান সুসংবদ্ধ ও বিজ্ঞানসম্মত নীতি, প্রণালী, পদ্ধতি এবং
আন্তর্জাতিক আদর্শমান অনুসরণের মাধ্যমে কারবারের সম্পদ রক্ষা ও যথোপযুক্ত পূর্বানুমোদন সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ব্যয় বা খরচ সম্পন্ন করে। বিশেষত হিসাববিজ্ঞান এমন একটি প্রক্রিয়া যা দূর্নীতি প্রতিরোধক ।
3. সম্পদ সংগ্রহ ও স্থানান্তর এর নির্ভরতা দানকারী বিজ্ঞান (Science of Resource Mobilization): হিসাববিজ্ঞান প্রদত্ত তথ্য ও আর্থিক বিবরণীর ওপর ভরসা করেই অভ্যন্তরীণ
সম্পদ সংগ্রহ তথা পুঁজি গঠন এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্টকরণ করা হয়।
4. সম্পদ বণ্টনকারী বিজ্ঞান (Science of Resource Allocation): হিসাববিজ্ঞান প্রদত্ত তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা ও নির্ভরতার ওপর ভিত্তি করেই ভবিষ্যৎ সম্পদের বিনিয়োগ
সিদ্ধান্ত প্রভাবিত হয় । বর্তমানে প্রাপ্ত হিসাব তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই ভবিষ্যতে সমগ্র জাতীয় সম্পদের সুষম বণ্টন ও বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বাভাষ প্রণয়ন করা হয়।
৫. নৈতিক মূল্যবোধ সৃষ্টিকারী বিজ্ঞান (Science of Ethical Values) : হিসাববিজ্ঞান নৈতিক চরিত্র উন্নয়নে অগ্রণী
ভূমিকা পালন করে । নৈতিক চরিত্রের উন্নয়ন হয় নৈতিক মূল্যবোধ থেকেই । নৈতিক মূল্যবোধ বলতে সৎপথের অনুসরণ এবং অসৎ পথকে পরিহার বুঝায় । অনৈতিক মানসিকতা দুর্নীতি, অপচয়, আত্মসাৎ,
অপব্যবহারকে উৎসাহিত করে ।
পরিশেষে বলা যায় যে, হিসাববিজ্ঞানের কার্যক্রম সম্পাদনে একই সাথে বহু ধরনের উদ্দেশ্য সাধিত হয় এবং প্রতিটি আলাদা আলাদা ভাবমূর্তি গড়ে উঠে ।